আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। এটি শুধু শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দিন নয়; বরং শোষণ, বৈষম্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক প্রতিরোধের প্রতীক। শ্রমিকশ্রেণির দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল হিসেবে “আট ঘণ্টা শ্রম, আট ঘণ্টা বিশ্রাম, আট ঘণ্টা নিজের জন্য” এই মানবিক দাবির স্বীকৃতি এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই অর্জনের আলো কি নারী শ্রমিকদের জীবনে সমানভাবে পৌঁছেছে? বাস্তবতা বলছে, না।
বিশ্বব্যাপী অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি আজ নারী শ্রম। কৃষি, শিল্প, গার্মেন্টস, স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণশিল্প, গৃহশ্রম থেকে শুরু করে অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমবাজার, প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারীর সক্রিয় উপস্থিতি দৃশ্যমান। বাংলাদেশের অর্থনীতির ক্ষেত্রেও নারী শ্রমিকদের অবদান অনস্বীকার্য। বিশেষত তৈরি পোশাকশিল্পে নারীর শ্রম দেশের রফতানি আয়ের ভিত নির্মাণ করেছে। অথচ দুঃখজনকভাবে, এই অবদান এখনো তাদের প্রাপ্য মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে পারেনি। নারী শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো, সমান শ্রম, অসম মজুরি। একই ধরনের কাজ, একই পরিমাণ শ্রম, একই উৎপাদনশীলতা তবুও নারী শ্রমিককে পুরুষের তুলনায় কম পারিশ্রমিক দেওয়া হয়। এটি শুধু অর্থনৈতিক বৈষম্য নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক অবিচারের বহিঃপ্রকাশ। শ্রমের মূল্য নির্ধারণে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য এক নৈতিক সংকট।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি নির্মম বাস্তবতা, অদৃশ্য শ্রমের বোঝা। কর্মস্থলে নির্ধারিত সময় শেষে অধিকাংশ নারীকে গৃহস্থালির দায়িত্ব পালন করতে হয়, রান্না, সন্তান প্রতিপালন, বয়স্কদের যত্ন এবং পরিবারের সার্বিক ব্যবস্থাপনা। এই শ্রমের কোনো আর্থিক স্বীকৃতি নেই, সামাজিক মূল্যায়নও সীমিত। ফলে নারী শ্রমিকের শ্রমঘণ্টা বাস্তবে কখনোই আট ঘণ্টায় সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা প্রায়ই দ্বিগুণ হয়ে যায়। শ্রমক্ষেত্রে নারীর জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিরাপত্তাহীনতা ও যৌন হয়রানি। কর্মক্ষেত্রে অপমানজনক মন্তব্য, অপ্রত্যাশিত স্পর্শ, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা পদোন্নতির শর্তে অনৈতিক চাপ, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একটি কাঠামোগত সমস্যার বহিঃপ্রকাশ। বিচারহীনতার সংস্কৃতি এই অন্যায়কে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। বিদেশগামী নারী শ্রমিকদের অবস্থাও সমানভাবে উদ্বেগজনক। উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় বিদেশে পাড়ি জমানো বহু নারী শ্রমিক নির্যাতন, শোষণ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হন। শ্রম রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিতে তাদের অবদান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব।
নারীর শ্রম অধিকার কেবল সামাজিক ন্যায্যতার প্রশ্ন নয়; এটি আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতারও বিষয়। জাতিসংঘের গৃহীত CEDAW নারীর বিরুদ্ধে সকল ধরনের বৈষম্য দূরীকরণে রাষ্ট্রকে বাধ্য করে। বিশেষত এর ১১ নম্বর অনুচ্ছেদ কর্মসংস্থান, সমান সুযোগ, সমান মজুরি ও সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলে। একইভাবে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার Equal Remuneration Convention, 1951 সমান মূল্যের কাজের জন্য সমান মজুরির নীতি প্রতিষ্ঠা করেছে। Discrimination (Employment and Occupation) Convention, 1958 কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য নিষিদ্ধ করেছে এবং Maternity Protection Convention, 2000 মাতৃত্বকালীন সুরক্ষাকে মৌলিক শ্রম অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানও সমতা ও বৈষম্যহীনতার অঙ্গীকার করে। কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে আইনের ব্যবধান এখনো বিস্তর। শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নে নীতিনির্ধারণ, আইন প্রয়োগ এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়ে গেছে। বিশেষত নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এই ঘাটতি আরও প্রকট।
শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সেই অংশগ্রহণকে মর্যাদাপূর্ণ, নিরাপদ ও ন্যায্য করা। লিঙ্গভিত্তিক ন্যায়বিচার মানে কেবল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি নয়; বরং এমন একটি পরিবেশ গড়ে তোলা যেখানে নারী শ্রমিক ভয়হীনভাবে কাজ করতে পারবেন, সমান মজুরি পাবেন, মাতৃত্ব তার পেশাগত অগ্রগতির অন্তরায় হবে না এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে তার কণ্ঠ সমান গুরুত্ব পাবে। মে দিবসের চেতনা তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন নারী শ্রমিকের শ্রমের যথার্থ মূল্যায়ন নিশ্চিত হবে, সমান কাজের জন্য সমান মজুরি বাস্তবায়িত হবে এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও মর্যাদা আইনি নিশ্চয়তার বাইরে সামাজিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠবে। কারণ নারী শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা কেবল নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা নয়; এটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার, সামাজিক ভারসাম্য এবং মানবিক অগ্রগতির অপরিহার্য শর্ত। এই মে দিবসে আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক, শ্রমের মর্যাদা হবে সর্বজনীন, মজুরি হবে বৈষম্যহীন, কর্মক্ষেত্র হবে নিরাপদ এবং নারী শ্রমিকের অধিকার হবে অবিচ্ছেদ্য মানবাধিকার। মে দিবস আমাদের ইতিহাসের শিক্ষা দেয়; এখন প্রয়োজন সেই শিক্ষাকে ন্যায়ের বাস্তবতায় রূপ দেওয়ার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং আইনি কার্যকারিতা।











